রুকইয়াহ কী এবং কেন?

রুকইয়াহ (الرُّقْيَة) হলো কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম ও গুণাবলি, এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমাণিত দোয়া ও যিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে শিফা ও সুরক্ষা চাওয়া।

রুকইয়াহ কোনো তাবিজ, মন্ত্র, জাদুবিদ্যা বা অজানা শব্দের মাধ্যমে চিকিৎসা নয়। বরং এটি হলো আল্লাহর কালাম ও বৈধ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য ও আরোগ্য প্রার্থনা করা।

মূল বিষয় হলো—শিফা দেন একমাত্র আল্লাহ। রুকইয়াহ নিজে কোনো স্বাধীন শক্তি নয়; এটি আল্লাহর কাছে চিকিৎসা ও সাহায্য চাওয়ার একটি বৈধ মাধ্যম।

কুরআন রুকইয়াহ সম্পর্কে কী বলে?

আল্লাহ তাআলা বলেন—

> “আমি কুরআন নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত।”
— সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮২

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, কুরআনের মধ্যে মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত রয়েছে।

আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেন—

> “হে মানুষ! তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এসেছে উপদেশ এবং অন্তরে যা আছে তার জন্য শিফা…”
— সূরা ইউনুস, ১০:৫৭

অর্থাৎ কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; এটি মানুষের অন্তরকে সংশোধন করে, ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে সাহায্য করে।

রাসূল ﷺ কি রুকইয়াহ করেছেন?

হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে রুকইয়াহ করেছেন এবং সাহাবাদেরও রুকইয়াহ করার অনুমতি দিয়েছেন।

সহিহ বুখারিতে এসেছে, এক সাহাবি সূরা ফাতিহা পড়ে বিচ্ছু দংশনে আক্রান্ত একজন ব্যক্তির ওপর রুকইয়াহ করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় সে ব্যক্তি সুস্থ হয়ে যায়। ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে জানানো হলে তিনি সেই রুকইয়াহকে অনুমোদন করেন।

এটি রুকইয়াহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি।

এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো—সাহাবি সূরা ফাতিহা ব্যবহার করেছেন এবং রাসূল ﷺ তা অনুমোদন করেছেন। ফলে কুরআনের মাধ্যমে শিফা চাওয়া সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।

রুকইয়াহ কি শুধু শারীরিক অসুস্থতার জন্য?

না। রুকইয়াহ বিভিন্ন ধরনের কষ্ট ও সমস্যার ক্ষেত্রে করা হয়েছে।

সহিহ হাদিসে বদনজর (আল-‘আইন)-এর জন্য রুকইয়াহ করার নির্দেশ এসেছে। আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বদনজরের ক্ষেত্রে রুকইয়াহ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আরেক হাদিসে উম্মু সালামা (রা.)-এর ঘরে একটি মেয়েকে দেখে রাসূল ﷺ তার জন্য রুকইয়াহ করার নির্দেশ দেন এবং বদনজরের কথা উল্লেখ করেন।

এছাড়াও বিষাক্ত প্রাণীর দংশনের ক্ষেত্রেও রুকইয়াহ অনুমোদিত হয়েছে।

তাই রুকইয়াহকে শুধু একটি নির্দিষ্ট সমস্যার চিকিৎসা হিসেবে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়।

রুকইয়াহ করার মূল উদ্দেশ্য কী?

রুকইয়াহর সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাওয়া।

মানুষ যখন অসুস্থ হয়, ভয় পায়, কোনো কষ্টে পড়ে বা কোনো বিপদে আক্রান্ত হয়—তখন সে আল্লাহর কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে।

রুকইয়াহ সেই তাওহিদ ও তাওয়াক্কুলকে আরও শক্তিশালী করে।

একজন মুসলিম বিশ্বাস করবে:

আল্লাহই শিফা দাতা।
কুরআন আল্লাহর কালাম।
দোয়া একটি ইবাদত।
রুকইয়াহ একটি বৈধ মাধ্যম।
কিন্তু শিফা দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর।

সব ধরনের রুকইয়াহ কি জায়েজ?

না।

ইসলামে এমন রুকইয়াহ জায়েজ নয় যার মধ্যে শিরক বা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কারও কাছে সাহায্য চাওয়া রয়েছে।

আউফ ইবনু মালিক (রা.) বলেন, তারা জাহেলি যুগে রুকইয়াহ করতেন। তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন:

> “তোমরা তোমাদের রুকইয়াহ আমার কাছে উপস্থাপন করো। যে রুকইয়াহতে শিরক নেই, তাতে কোনো সমস্যা নেই।”
— সহিহ মুসলিম ২২০০

সুতরাং রুকইয়াহ বৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে শিরকমুক্ত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শরিয়তসম্মত রুকইয়াহর বৈশিষ্ট্য:

শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ সাধারণভাবে এমন হবে—

১. কুরআনের আয়াত দিয়ে:

যেমন—

-সূরা ফাতিহা

-আয়াতুল কুরসি

-সূরা ইখলাস

-সূরা ফালাক

-সূরা নাস

-এবং কুরআনের অন্যান্য আয়াত

২. সহিহ দোয়া দিয়ে:

রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমাণিত বিভিন্ন দোয়া ও যিকির পড়া যায়।

৩. শিরকমুক্ত হতে হবে:

অজানা কোনো মন্ত্র, শিরকপূর্ণ বাক্য, জিনের কাছে সাহায্য চাওয়া কিংবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে ফরিয়াদ করা শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ নয়।

৪. বিশ্বাস থাকতে হবে যে শিফা আল্লাহর পক্ষ থেকে:

কুরআন বা দোয়া নিজের স্বাধীন ক্ষমতায় কাউকে সুস্থ করে—এমন বিশ্বাস সঠিক নয়।

রুকইয়াহ কেন করা উচিত?

রুকইয়াহ করার অন্যতম কারণ হলো, এটি মুসলিমকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে সাহায্য করে।

কষ্টের সময় মানুষ সাধারণত বিভিন্ন জায়গায় সমাধান খোঁজে। কিন্তু একজন মুমিনের প্রথম আশ্রয় হওয়া উচিত তার রব।

কুরআন নিজেই মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

তাই অসুস্থতা বা কোনো কষ্টের সময় চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়া করা, কুরআন তিলাওয়াত করা এবং শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ করা একজন মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আমল হতে পারে।

রুকইয়াহ মানেই কি জিন বা জাদু?

না।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

রুকইয়াহ শুধু জিন, জাদু বা বদনজরের জন্য নয়। রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহতে অসুস্থতা, বদনজর এবং বিভিন্ন কষ্টের ক্ষেত্রে রুকইয়াহর অনুমোদন পাওয়া যায়।

তাই কোনো মানুষের শারীরিক বা মানসিক সমস্যা হলেই তাকে নিশ্চিতভাবে জিন, জাদু বা বদনজরে আক্রান্ত বলা উচিত নয়।

অনেক অসুস্থতার স্বাভাবিক শারীরিক বা মানসিক কারণও থাকতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে যোগ্য চিকিৎসকের চিকিৎসাও গ্রহণ করতে হবে। রুকইয়াহ ও চিকিৎসা পরস্পরের বিরোধী নয়।

রুকইয়াহ ও চিকিৎসা:

ইসলাম চিকিৎসা গ্রহণ করতে নিষেধ করে না।

বরং একজন মুসলিম আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করবে এবং একই সঙ্গে আল্লাহর কাছে শিফা চাইবে।

অর্থাৎ—

ডাক্তারের চিকিৎসা গ্রহণ করব → আল্লাহর ওপর ভরসা রাখব → দোয়া করব → কুরআন তিলাওয়াত করব → শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ করব।

সবকিছুর ঊর্ধ্বে বিশ্বাস থাকবে—

শিফা একমাত্র আল্লাহর হাতে।

নিজে রুকইয়াহ করা কি সম্ভব?

হ্যাঁ। বরং একজন মুসলিম নিজের জন্য কুরআন তিলাওয়াত ও মাসনূন দোয়া করতে পারে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহতে নিজের ওপর রুকইয়াহ করার দৃষ্টান্ত রয়েছে।

তাই রুকইয়াহ করার জন্য সবসময় অন্য কারও ওপর নির্ভর করা প্রয়োজন নেই।

নিজে কুরআন পড়া, দোয়া করা, সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া—এসবই একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রুকইয়াহর ক্ষেত্রে যেসব বিষয় থেকে সতর্ক থাকতে হবে

রুকইয়াহর নামে অনেক ধরনের ভুল ও কুসংস্কার সমাজে প্রচলিত আছে।

যেমন—

-অজানা মন্ত্র বা শব্দ ব্যবহার করা

-শিরকমূলক বাক্য পড়া

-জিনের কাছে সাহায্য চাওয়া

-তাবিজ-কবচকে শিফার মাধ্যম মনে করা

-নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া কাউকে জিন/জাদু আক্রান্ত বলে ঘোষণা করা

-চিকিৎসাযোগ্য অসুস্থতার চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া

-ভয় দেখিয়ে রোগীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া

এসব থেকে একজন মুসলিমকে সতর্ক থাকতে হবে।

রাসূল ﷺ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যে রুকইয়াহতে শিরক নেই, সেটিই গ্রহণযোগ্য।

তাহলে রুকইয়াহ আসলে কী?

সংক্ষেপে বলা যায়—

রুকইয়াহ হলো কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম ও গুণাবলি এবং রাসূল ﷺ থেকে প্রমাণিত দোয়া-যিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে শিফা, সুরক্ষা ও সাহায্য চাওয়া।

এটি কোনো জাদু নয়।

এটি কোনো রহস্যময় মন্ত্র নয়।

এটি কোনো স্বাধীন চিকিৎসাশক্তিও নয়।

বরং এটি একজন বান্দার আল্লাহর ওপর ভরসা, দোয়া ও ইবাদতের একটি মাধ্যম।

আল্লাহ বলেন:

> “আমি কুরআন নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত।”
— সূরা আল-ইসরা: ৮২

আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, শিরকমুক্ত রুকইয়াহতে কোনো সমস্যা নেই।

তাই রুকইয়াহর মূল শিক্ষা হলো—

কুরআনের দিকে ফিরে আসা, সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং সব ধরনের সাহায্য ও শিফার জন্য একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করা।

**আল্লাহ আমাদের কুরআনকে বুঝে পড়ার, সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার এবং সব ধরনের শিরক ও কুসংস্কার থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।**